কোয়েল পাখি পালনে খামারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ

কোয়েল পাখির খামার পরিচালনার জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণের প্রয়োজন হয় নিম্নে এগুলোর একটি তালিকা প্রদান করা হলঃ যথা-

  • ব্রুডার হোভার
  • হিটার/স্টোভ
  • প্লাস্টিকের টিক ফিড ট্রে
  • খাবার পাত্র
  • পানির পাত্র
  • ডিম পাড়ার বাক্স (লিটার পদ্ধতির ক্ষেত্রে)
  • ইলেকট্রিক বাল্ব
  • নিক্তি বা ব্যালান্স
  • বালতি, বেলচা, কোদাল, বাটি, চাকু, ঝুড়ি, আঁচড়া, টুলি ইত্যাদি৷
  • খাঁচাতে পালন করলে প্রয়োজনীয় খাঁচা৷
  • বাঁশ, কাঠ, ঢেউটিন, পলিথিন বা ত্রিপল ইত্যাদি৷
  • থার্মোমিটার, হাইপ্রোমিটার
  • লিটার সামগ্রী (তুষ, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি)
  • ব্যাটারী ব্রুডার৷
  • ডিম পাড়ার বাসা

নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি ও উপকরণের বর্ণনা দেওয়া হলোঃ

খাবার পাত্র  (Feeder)

একটি উৎকৃষ্টমানের কোয়েলের খাবার পাত্রের বৈশিষ্ট হবে;

  • একটি খাদ্য দিয়ে সহজেয়ই পূর্ণ করা যাবে৷
  • পরিস্কার করা সহজ হবে৷

পানির পাত্র (Water or drunker)

খাঁচা বা লিটার যে পদ্ধতিতেই পালন করা হোক না কেন একটি উৎকৃষ্টমানের কোয়েলের পানির পাত্রের বৈশিষ্ট হবে নিম্নরূপ-

  • এটি থেকে পাখি পরিচ্ছন্ন পানির সরবরাহ পাবে৷
  • এটি পানি পানের উপযোগী হবে৷
  • পরিস্কার করা সহজ হবে৷
  • টেকসই ও দামে সস্তা হবে৷

ব্রুডার হোভার ও বাচ্চা বেস্টনী  (Brooder hover & chick quard)

একদিন বয়সী বাচ্চাগুলোকে সাধারণত ব্রুডারের সাহায্যেই বাঁচিয়ে তোলা ও বড় করা হয়৷ ব্রুডারে একটি তাপের উৎস থাকে, যেমন- বৈদ্যতিক হিটার,বৈদ্যুতিক বাল্ব, কেরোসিন বাতি, তুষ ,কাঠ বা কয়লার বাতি হ্যাজাক লাইট বা ইনফ্রারেড বাল্ব৷ তবে ইনফ্রারেড বাল্বই হল সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত৷

ব্রডারে একটি ছাতায় যত অংশ থাকে যা হোভার নামে পরিচিত৷ এটি বর্গাকার, আয়তকার, ষড়ভুজাকৃতি বা গোলাকার হতে পারে৷ ব্রডারের হোভারটি জি.আই.পাত বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তৈরি করা যায়৷

বাচ্চারা যাতে ব্রুডারের ভিতর সঠিকভাবে খাদ্য ও পানি গ্রহণ করতে পারে এবং এক জায়গাতে থাকতে পারে সেজন্য হোভারের চারিদিকে ১৫ সে. মি. দূরত্বে গোলাকার একটি বেষ্টনী দেয়া হয় যাকে বলা হয় চিক গার্ড, এটি টিন, চাটাই, হার্ডবোর্ড বা মোটা কাগজ দিয়ে তৈরি করা যায়৷

ডিম পাড়ার বাসা (Laying nest) : ডিম পাড়ার বাসা প্রতিটি পাখির জন্য ব্যক্তিগত এবং একসঙ্গেও হতে পারে, ব্যক্তিগত বাসার ক্ষেত্রে ১৫ সে.মি. চওড়া, ২০সে.মি  গভীর ও ২০ সে.মি উচ্চতা বিশিষ্টবাক্সের ব্যবস্থা করতে হবে৷ আর যৌথ বাসার ক্ষেত্রে ১.০ মিটার লম্বা, ২০ সে.মি. গভীর ও ২০ সে.মি. উচ্চতা বিশিষ্ট বাক্সের ব্যবস্থা করতে হবে৷

কোয়েল পাখির খাঁচা তৈরী

কোয়েল পাখি পালনে খাঁচা বা ব্যাটারী পদ্ধতি সহজ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত৷ অল্প জায়গায় অধিক সংখ্যায় কোয়েল পালন করতে ব্যাটারী পদ্ধতির জুড়ি নেই৷ বিভিন্ন বয়সের কোয়েল পালনের জন্য বিভিন্ন প্রকার খাঁচা, যেমন- ব্রডার খাঁচা, বিয়ারিং খাঁচা, লেয়ার খাঁচা, ব্রিডার খাঁচা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়৷  

ব্যাটারি ব্রুডার (Battery Brooder): একদিন বয়স থেকে ২-৩ বা অবস্থাভেদে ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত নিরাপদে ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে লালনপালনের জন্য ব্যাটারি ব্রুডারই উৎকৃষ্ট৷ ব্যাটারি ব্রুডার ইউনিটের প্রতিটি তলা (tier) দৈর্ঘ্য ১৬০ সে.মি., প্রস্থ ৮০ সে.মি. এবং উচ্চতায় ২৫ সে.মি. হবে৷

বিয়ারিং খাঁচা (Rearing cage): তিন/চার সপ্তাহ বয়স থেকে ডিম পাড়ার পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ৫-৬ বা অবস্থাভেদে ৪-৫ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত কোয়েলকে গ্রোয়ার ঘরে বা বিয়ারিং খাঁচায় পালন করা হয়৷

বয়ষ্ক কোয়েলের খাঁচা (Cages for adult quails):  কোয়েল যখন ডিম পাড়ার উপযোগী হয় তখন এদের বিয়ারিং খাঁচা থেকে লেয়িং খাঁচায় স্থানান্তর করা হয়৷

লিটার ও লিটার ব্যবস্থাপনা

লিটার: পোল্ট্রির ঘরে শস্যা হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তুকে লিটার বলে৷ এক কথায় বাসস্থানকে আরামদায়ক করার জন্য কোয়েলের ঘরে যে বিছানা ব্যবহার করা হয় তাই লিটার।

লিটারের উপকরণ: লিটার হিসেবে সাধারণত ধানের তুষ, করাতের গুঁড়া, ধান বা গমের শুকনো খড়ের টুকরো, কাঠের ছিলকা, বাদামের খোসার গুঁড়া ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়৷ এগুলো এককভাবে ব্যবহার না করে সাধারণত কয়েকটি একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা ভাল।

লিটার প্রস্তুত

  • শুরুতে ৫ সে.মি. পুরু লিটার সামগ্রী পরিস্কার মেঝেতে ছড়িয়ে দিতে হবে৷
  • ধীরে ধীরে আরো লিটার সামগ্রী যোগ করে ৪-৫ সপ্তাহের মধ্যে এই পুরুত্ব ১০ সে.মি.-এ উন্নীত করতে হবে৷
  • ব্যাটারি ব্রুডারে পালিত বাচ্চার ক্ষেত্রে শুরুতেই ১০ সে.মি. পুরু লিটার ব্যবহার করতে হবে৷
  • স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাজা লিটার সামগ্রী বিছানোর পরপরই কোনো উৎকৃষ্টমানের ও কার্যকরী জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে৷ তবে, বাচ্চা নামানোর ৯৬ ঘন্টা পূর্বেই একাজ শেষ করতে হবে৷

লিটারের পরিচর্যা

  •  উৎকৃষ্ট লিটারের আর্দ্রতা সবসময় ২৫-৩০% হওয়া উচিত৷
  • অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে৷
  • লিটারের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রক্ষার জন্য ঘনঘন লিটার উল্টেপাল্টে দিতে হবে৷
  • ঘরে বায়ু চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে৷
  • বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে ৪-৫ কেজি/১০ ঘনমিটার জায়গা (ফ্লোর এরিয়া) হিসেবে লিটারে কালিচুন (স্ল্যাকড লাইম) যোগ করতে হবে৷
  • পানির পাত্রের চারদিকের ভিজা লিটার বদলে তাজা লিটার সামগ্রী দিতে হবে৷
  • অতিরিক্ত গরমে লিটারের আর্দ্রতা কমে গেলে স্প্রে’র মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে আর্দ্রতা ঠিক রাখতে হবে৷

ব্রুডিং (Brooding)

ছোট বাচ্চাদের তা বা তাপ দেয়াকে ব্রুডিং বলে৷ ব্রুডিং দুপ্রকার যথা-

  • প্রাকৃতিক ব্রুডিং (Natural brooding)
  • কৃত্রিম ব্রুডিং (Artificial brooding)

প্রাকৃতিক ব্রুডিং: এ পদ্ধতিতে প্রাকৃতিভাবে ছোট আকারের দেশী মুরগীর (Foster Hen) সাহায্যে বাচ্চাকে তাপ দেওয়া হয়৷ এটি অল্প সংখ্যক বাচ্চার জন্য একটি অত্যন্ত ভাল পদ্ধতি৷

কৃত্রিম ব্রুডিং: মুরগীর সাহায্য ছাড়া কৃত্রিম পদ্ধতিতে ব্রুডারের মাধ্যমে বাচ্চা তাপ দেওয়াকে কৃত্রিম ব্রুডিং বলে৷ কৃত্রিম ব্রুডিং এর মধ্যে রয়েছে লিটার, ব্রুডিং, ঠাণ্ডা ব্রুডিং, উষ্ণ ব্রুডিং, ব্যাটারি বা খাঁচা ব্রুডিং ইত্যাদি

ব্রুডিংএর মূলনীতি (Brooding principles): লেয়ার বা ব্রয়লার সব ধরণের কোয়েলের ক্ষেত্রে ব্রুডিং ব্যবস্থা একই রকম৷ ব্রুডিংকালে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি যত্মশীল হতে হবে৷ যেমন-

  • সঠিক তাপমাত্রা
  • পর্যাপ্ত আলো
  • বায়ু চলাচল ব্যবস্থা
  • বাচ্চার ঘনত্ব (সংখ্যা)
  • খাদ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা
  • স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ইত্যাদি৷

ব্রুডারে বাচ্চা তোলার পূর্বে করণীয়

  • খামারে বাচ্চা তোলার অন্তত দু’সপ্তাহ আগে ব্রুডার ঘর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে৷
  • ঘরে বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশের জন্য ভেনটিলেটর ও দরজাগুলো খুলে রাখতে হবে৷
  • বাচ্চা আসার দু’দিন আগে সব যন্ত্রপাতি চালু করতে হবে৷
  • খামার পাত্রগুলো পুরো ব্রুডিং এলাকায় সমান দূরত্বে স্থাপন করতে হবে৷
  • পানির পাত্রগুলো খাবার পাত্রগুলোর মাঝখানে রাখতে হবে৷
  • বাচ্চা বেষ্টনী সঠিকভাবে দিতে হবে৷
  • হোভারের নিচে তাপ সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে৷
  • ব্রুডারে বাচ্চা দেয়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে কাগজ বা কার্ডবোর্ড বিছিয়ে তার উপর খাবার ছিটিয়ে দিতে হবে৷
  • এদের সামনে ধকল-প্রতিরোধী উপাদান, যেমন-৮% গ্লুকোজ মিশ্রিত পানি, ভিটামিন সি ইত্যাদি রাখতে হবে৷

ব্রুডারে বাচ্চা তোলার সঙ্গে সঙ্গে করণীয়

  • ব্রুডারে বাচ্চা আসার সঙ্গে সঙ্গেই এদের ব্রুডারের হোভারের নিচে সমভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে৷
  • ধকল-প্রতিরোধী উপাদান (গ্লুকোজ মিশ্রিত পানি, ভিটামিন সিইত্যাদি) মিশ্রিত পানি এদের সামনে দিতে হবে৷
  • ব্রুডারে বাচ্চা রাতের আগেই তুলতে হবে, এতে বাচ্চা পর্যবেক্ষণের যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে৷
  • বাচ্চাদের বৃদ্ধি সঠিক হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে৷
  • আবহাওয়া ও দৈহিক বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে এদের বিয়ারিং পর্বে পালনের ঘর বা কেইজে স্থানান্তর করতে হবে৷
  • তিন সপ্তাহ বয়সে কোয়েল-কোয়েলী আলাদা করে ফেলতে হবে৷

কৃত্রিম ব্রুডংয়ের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি

কৃত্রিম ব্রুডিংয়ের জন্য নিম্নলিখিত যন্ত্রগুলোর প্রয়োজন হবে৷ যথা-

  • ব্রুডার বা বাচ্চা তাপানোর যন্ত্র৷
  • চিক গার্ড/ব্রুডার বা বাচ্চা বেষ্টনী৷
  • ব্রুডার চুল্লি বা হিটার৷
  • হোভার৷
  • লিটার বা বিছানা৷
  • থার্মোমিটার৷
  • হাইগ্রোমিটার৷
  • খাদ্য ও পানির পাত্র৷